Wednesday, 21 October 2020

নবদুর্গাঃ-



শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণে হরিহরব্রহ্মবিরচিত দেবীকবচে বর্ণিত আছে-

প্রথমং শৈলপুত্রীতি দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী .
তৃতীয়ং চন্দ্রঘণ্টেতি কূষ্মাণ্ডেতি চতুর্থকম্ .. ৩..
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা .
সপ্তমং কালরাত্রিশ্চ মহাগৌরীতি চাষ্টমম্ .. ৪..
নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গাঃ প্রকীর্তিতাঃ .
উক্তান্যেতানি নামানি ব্রহ্মণৈব মহাত্মনা .. ৫..

অনুবাদঃ- প্রথম শৈলপুত্রী, দ্বিতীয় ব্রহ্মচারিণী, তৃতীয় চন্দ্রঘন্টা, চতুর্থ কুষ্মাণ্ডা, পঞ্চম স্কন্দমাতা, ষষ্ঠ কাত্যায়নী, সপ্তম কালরাত্রি, অষ্টম মহাগৌরী এবং নবম সিদ্ধিদাত্রী (মোক্ষদা)- ইহারা নবদুর্গা বলিয়া প্রকীর্তিতা। এই সকল নাম সর্বজ্ঞ বেদ কর্তৃক উক্ত হইয়াছে ।।৩-৫।।

ব্যাখ্যাঃ-

১. শৈলপুত্রী-কূর্ম্মপুরাণমতে দেবী কারুণ্যবশে শৈল ভক্তের পুত্রীত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন।

২. ব্রহ্মচারিণী-তিনি ব্রহ্মজ্ঞানপ্রদা, কারণ ভক্তকে ব্রহ্মপ্রাপ্তি করানোই তাঁহার স্বভাব।

৩. চন্দ্রঘন্টা-চন্দ্রবৎ নির্মলঘণ্টা যাঁহার বা যিনি চন্দ্রাপেক্ষা অতিশয় লাবণ্যবতী বা আহ্লাদকারিণী।

৪. কুষ্মাণ্ডা- গুপ্তবতীটীকা অনুসারে- 'কু(কুৎসিত) উষ্ম(সন্তাপত্রয়) যে সংসারে, সেই সংসার যাঁহার অণ্ডে (উদরে) তিনি কুষ্মাণ্ড অর্থাৎ ত্রিবিধতাপযুক্ত-সংসার-ভক্ষণ-কর্ত্রী।'

৫. স্কন্দমাতা-ভগবতী হইতে উৎপন্ন বলিয়া সনৎকুমারের অন্য নাম স্কন্দ; তাঁহার মাতা স্কন্দমাতা।

৬. কাত্যায়নী- কাত্যায়নাশ্রমে দেবকার্য্যের জন্য আবির্ভূত হইয়া তিনি মুনির কন্যাত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম কাত্যায়নী।

৭. কালরাত্রি- দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে-'তিনি সর্বমারক কালেরও নাশিকা, কারণ মহাপ্রলয়ে কালেরও বিনাশ হয়।'

কাশীধামে নবদুর্গার নয়টী পৃথক মন্দির রয়েছে। নবরাত্রির সময় প্রতিপদ হইতে নবমী পর্যন্ত নয় দিবস যথাক্রমে শৈলপুত্রী হইতে সিদ্ধিধাত্রী মন্দিরে প্রত্যহ নবদুর্গার দর্শনার্থ নরনারীর ভিড় হয়।
...................................................................................................
তথ্যসূত্রঃ- শ্রীশ্রীচণ্ডী, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলিকাতা, চতুর্থ সংস্করণ, মাঘ ১৪০২।

Saturday, 20 June 2020

অর্গলা স্তোত্রঃ-


দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে-বারাহী তন্ত্রে বর্ণিত আছে,'অর্গলাস্তোত্র পাপ নাশ করে।' সিদ্ধির প্রতিবন্ধক পাপ অর্গলা সদৃশ। সেই পাপনাশক স্তোত্রেরও লক্ষণা দ্বারা অর্গলা নাম হইয়াছে।
ॐ অস্য শ্রীঅর্গলাস্তোত্রমন্ত্রস্য বিষ্ণুর্ঋষিঃ অনুষ্টুপ্ছন্দঃ শ্রীমহালক্ষ্মীর্দেবতা শ্রীজগদম্বাপ্রীত্যর্থং সপ্তশতীপাঠাঙ্গজপে বিনিয়োগঃ। এই অর্গলাস্তোত্রের ঋষি হলেন বিষ্ণু, ছন্দ হল অনুষ্টুপ ও দেবতা হলেন শ্রীমহালক্ষ্মী। জগজ্জননীর প্রীতির জন্য শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের অঙ্গরূপে এই স্তোত্র পাঠ করা হয়।
ॐ মার্কণ্ডেয় উবাচ।
ॐ জয় ত্বং দেবি চামুণ্ডে জয় ভূতাপহারিণি।
জয় সর্বগতে দেবি কালরাত্রি নমোঽস্তু তে।। ১

মার্কণ্ডেয় বললেন–
হে দেবী চামূণ্ডা, তোমার জয় হোক। হে দেবী, তুমি জীবের দুঃখনাশকারিণী; তুমি সর্বভূতে অবস্থিতা; আবার তুমিই প্রলয়ের অন্ধকার স্বরূপিণী কালরাত্রি। তোমায় নমস্কার করি।১

জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী ।
দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে ।। ২

হে দেবী, তুমি জয়ন্তী (জয়যুক্তা বা সর্বোৎকৃষ্টা), মঙ্গলা (জন্মমরণাদি বিকার নাশিনী); কালী (সর্বসংহারিণী), ভদ্রকালী (মঙ্গল-দায়িনী), কপালিনী (প্রলয়কালে ব্রহ্মাদির কপাল হস্তে বিচরণকারিণী), দুর্গা (দুঃখপ্রাপ্যা), শিবা (চিৎস্বরূপা), ক্ষমা (করুণাময়ী), ধাত্রী (বিশ্বধারিণী), স্বাহা (দেবপোষিণী) এবং স্বধা (পিতৃতোষিণী)-রূপা, তোমাকে নমস্কার।২
মধুকৈটভবিধ্বংসি বিধাতৃ-বরদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৩

হে মধুকৈটভনাশিনি, হে ব্রহ্মাবরদায়িনি তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার (কাম-ক্রোধাদি) শত্রু নাশ কর।৩
মহিষাসুরনির্ণাশি ভক্তনাং সুখদে নমঃ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৪

হে মহিষাসুরনাশিনি ও ভক্তগণের সুখদায়িনি, তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।৪
ধূম্রনেত্রবধে দেবি ধর্মকামার্থদায়িনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৫

হে দেবী, তুমি ধূম্রলোচন অসুরকে বধ করেছিলে। আবার তুমিই ভক্তকে ধর্ম, অর্থ ও কাম প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ শ্রুতিপ্রসিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞান লাভজনিত যশ প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
রক্তবীজবধে দেবি চণ্ডমুণ্ডবিনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৬

হে দেবী, তুমি রক্তবীজ, চণ্ড ও মুণ্ড অসুরত্রয়কে বধ করেছিলে। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
শুম্ভনিশুম্ভনির্ণাশি ত্রৈলোক্যশুভদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৭

হে দেবী, তুমি শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করেছিলে। আবার তুমিই তিন লোকের কল্যাণকারিনী। তোমায় প্রণাম করি। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।৭
বন্দিতাঙ্ঘ্রিযুগে দেবি সর্বসৌভাগ্যদায়িনি ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৮

হে মহিষাসুরনাশিনি ও ভক্তগণের সুখদায়িনি, তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।
অচিন্ত্যরূপচরিতে সর্বশত্রুবিনাশিনি ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৯

হে অচিন্ত্য-রূপ-চরিত্রে সর্বশত্রুবিনাশিনি দেবি, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।
নতেভ্যঃ সর্বদা ভক্ত্যা চাপর্ণে দুরিতাপহে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১০

হে অর্পণে, আশ্রিত ভক্তের পাপনাশিনি হে দেবি, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১০
ব্যাখ্যাঃ-অপর্ণা-ন+পর্ণ(পত্র)। পার্বতী যখন শিবকে পতিরূপে লাভ করিবার জন্য তপস্যা করিয়াছিলেন, সেই সময় তিনি একটি গলিত পাতাও ভক্ষণ করেননি। তাই তাঁহার অপর নাম হয় অপর্ণা।
স্তুবদ্ভ্যো ভক্তিপূর্বং ত্বাং চণ্ডিকে ব্যাধিনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১১

হে দেবী চণ্ডিকা, যে ভক্তিসহকারে তোমার স্তব করে, তুমি তার ব্যাধি নাশ করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
চণ্ডিকে সততং যুদ্ধে জয়ন্তি পাপনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১২

হে দেবী চণ্ডিকা, তুমি সতত যুদ্ধে বিজয়িনী ও পাপনাশিনী। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১২
দেহি সৌভাগ্যমারোগ্যং দেহি দেবি পরং সুখম্ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১৩

হে দেবি, আমায় সৌভাগ্য ও আরোগ্য দাও এবং পরম সুখ দাও। আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১৩
বিধেহি দেবি কল্যাণং বিধেহি বিপুলাং শ্রিয়ম্ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১৪

হে দেবি, আমার কল্যাণ বিধান কর এবং আমাকে বিপুল শ্রী (ঐশ্বর্য) প্রদান কর।আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১৪
বিধেহি দ্বিষতাং নাশং বিধেহি বলমুচ্চকৈঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৫

হে দেবী, তুমি আমার শত্রুনাশের সহায়ক হও। আমাকে দাও প্রচুর বল। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৫
সুরাসুরশিরোরত্ননিঘৃষ্টচরণাম্বুজে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৬

হে দেবী, দেবতা ও অসুরগণের মুকুটের মণি তোমার চরণপদ্মে লুটায়। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৬
ব্যাখ্যাঃ- দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে দেবীর স্বরূপ দর্শন দ্বারা দেবাসুরগণের নির্বৈরতারূপ অদ্বৈতভাব ধ্বনিত হইয়াছে।
বিদ্যাবন্তং যশোস্বন্তং লক্ষ্মীবন্তঞ্চ মাং কুরু।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৭

তুমি আমাকে ব্রহ্মবিদ্যা, যশ ও ধন প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৭
দেবি প্রচণ্ডদোর্দণ্ডদৈত্যদর্পনিষূদিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৮

হে দেবী, তুমি প্রবল পরাক্রমশালী দৈত্যের দর্প চূর্ণ করেছো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৮
প্রচণ্ডদৈত্যদর্পঘ্নে চণ্ডিকে প্রণতায় মে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৯

হে দেবী চণ্ডিকা, তুমি প্রচণ্ড দৈত্যের দর্প হরণ করেছো। তোমার পায়ে সতত আমার প্রণাম রাখি। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৯
চতুর্ভূজে চতুর্বক্রসংস্তুতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২০

হে চতুর্ভূজা দেবী, হে পরমেশ্বরী, ব্রহ্মা চার মুখে তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২০
কৃষ্ণেন সংস্তুতে দেবি শশ্বদ্ভক্ত্যা সদাম্বিকে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২১

হে দেবী অম্বিকা, কৃষ্ণ সর্বদা ভক্তিসহকারে তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২১
হিমাচলসুতানাথসংস্তুতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২২

হে পরমেশ্বরী, হিমালয়ের কন্যা উমার পতি শিব সর্বদা তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২২
ইন্দ্রাণীপতিসদ্ভাবপূজিতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২৩

হে পরমেশ্বরী, দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী শচী স্বামীর সন্ধান পাওয়ার জন্য তোমার পূজা করিয়াছিলেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২৩
ব্যাখ্যাঃ-গুপ্তবতী টীকা অনুসারে- পুরাণ বলে, দুর্বাশার অভিশাপে লক্ষ্মীহারা হয়ে ইন্দ্র সকলের অজ্ঞাতে একটি সরোবরের পদ্মের মৃণালে আত্মগোপন করেন। সেই সময় ইন্দ্রের পত্নী পৌলোমী চণ্ডীর আরাধনা করে স্বামীর সন্ধান পান।
দেবি ভক্তজনোদ্দাম-দত্তানন্দদয়েঽম্বিকে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ২৪

হে দেবি, ভক্তজনের হৃদয়ে অপার-আনন্দদয়কারিণি হে অম্বিকে, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।২৪
ভার্যাং মনোরমাং দেহি মনোবৃত্ত্যানুসারিণীম্।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২৫

হে দেবী, আমার মন বুঝে চলবে এমন মনোরমা পত্নী আমাকে প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২৫
তারিণি দুর্গসংসার-সাগরস্যাচলোদ্ভবে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ২৬

দুস্তর-সংসার-সাগরতারিণি হে গিরিসুতে, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।২৬
ইদং স্তোত্রং পঠিত্বা তু মহাস্তোত্রং পঠেন্নরঃ।
সপ্তশতী সমারাধ্য বরমাপ্নোতি দুর্লভম্।। ২৭

এই স্তোত্র পাঠ করে মহাস্তোত্র সপ্তশতীস্তব পাঠ করতে হয়। এইভাবে সপ্তশতীর পূজা করলে মানুষ দুর্লভ বর পায়।২৭
ইতি অর্গলাস্তোত্রম্ সমাপ্তম্।
গুপ্তবতী ও দুর্গাপ্রদীপ টীকাদ্বয় অনুসারে অর্গলাস্তোত্র সমাপ্ত।

Friday, 19 June 2020

মহাভারতে শ্ৰীদুৰ্গা স্তোত্ৰম্ঃ-


শ্রীমহাভারতে ভীষ্মপর্বান্তর্গতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাপর্বণি ত্রয়োবিংশোঽধ্যায়ঃ ।
সঞ্জয় উবাচ -
ধার্তরাষ্ট্রবলং দৃষ্ট্বা য়ুদ্ধায় সমুপস্থিতম্ ।
অর্জুনস্য হিতার্থায় কৃষ্ণো বচনমব্রবীত্ ॥ ১॥
শ্রীভগবানুবাচ -
শুচির্ভূত্বা মহাবাহো সঙ্গ্রামাভিমুখে স্থিতঃ ।
পরাজয়ায় শত্রূণাং দুর্গাস্তোত্রমুদীরয় ॥ ২॥

ভাবার্থঃ-সঞ্জয় বলিলেন,-কৃষ্ণ যুদ্ধোদ্যত ধাৰ্ত্তরাষ্ট্র সৈন্য দর্শন করিয়া অর্জ্জুনের হিতের জন্য কহিলেন,-হে মহাবাহো ! তুমি শত্রু পরাজয়ের নিমিত্ত শুচি হইয়া এবং সংগ্ৰামাভিমুখী হইয়া দুৰ্গাস্তোত্র কীৰ্ত্তন কর ॥ ১-২
সঞ্জয় উবাচ -
এবমুক্তোঽর্জুনঃ সঙ্খ্যে বাসুদেবেন ধীমতা ।
অবতীর্যং রথাত্ পার্থঃ স্তোত্রমাহ কৃতাঞ্জলিঃ ॥ ৩॥

ভাবার্থঃ-সঞ্জয় বলিলেন,-ধীমান্ বাসুদেব অৰ্জ্জুনকে এইরূপ বলিলে, পার্থ রথ হইতে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া কৃতাঞ্জলি পূর্বক দুর্গার স্তব করিতে লাগিলেন ৷৷ ৩
'অথ দুর্গাদেবীস্তবম্ ।'
শ্রীঅর্জুন উবাচ -
নমস্তে সিদ্ধসেনানি আর্যে মন্দরবাসিনি ।
কুমারি কালি কাপালি কপিলে কৃষ্ণপিঙ্গলে ॥ ১॥

ভাবার্থঃ-হে আৰ্য্যে ! হে সিদ্ধসেনানি ! তুমি মন্দরাচলবাসিনী, তুমি কুমারী, তুমি কালী, তুমি কাপালী, তুমি কপিলা, ও তুমি কৃষ্ণপিঙ্গলা ; তোমাকে নমস্কার ৷
ভদ্রকালি নমস্তুভ্যম্ মহাকালি নমোস্তুতে ।
চণ্ডিচণ্ডে নমস্তুভ্যম্ তারিণি বরবর্ণিনি ॥ ২॥

ভাবার্থঃ-হে ভদ্রকালি ! তোমাকে প্ৰণাম, হে মহাকালি ! তোমাকে প্ৰণাম । হে চণ্ডি ! হে চণ্ডে ! হে তারিণি ! হে বরবর্ণিনি ! তোমাকে নমস্কার ॥
কাত্যায়নি মহাভাগে করালি বিজয়ে জয়ে ।
শিখিপিচ্ছধ্বজধরে নানাভরণভূষিতে ॥ ৩॥
অট্টশূলপ্রহরণে খড্গখেটধারিণি ।
গোপেন্দ্রস্যানুজে জ্যেষ্টে নন্দগোপকুলোদ্ভবে ॥ ৪॥
মহিষাসৃক্প্রিয়ে নিত্যং কৌশিকি পীতবাসিনি ।
অট্টহাসে কোকমুখে নমস্তেঽস্তু রণপ্রিয়ে ॥ ৫॥

ভাবার্থঃ-হে কাত্যায়নি ! হে মহাভাগে ! হে করালি ! হে বিজয়ে । হে জয়ে ! তুমি ময়ূরপুচ্ছ মস্তকে ধারণ করিয়াছ এবং নানাভারণে বিভূষিতা; তুমি অট্টশূল, খড়গ ও খেটকধারিণী, তুমি শ্ৰীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠা ভগিনী, তুমি নন্দগোপকুলসম্ভূতা । তুমি সৰ্ব্বদা মহিষরক্তপ্রিয়া, তুমি কৌশিকী, তুমি পীতবাসিনী, তুমি অট্টহাসিনী, তুমি চক্ৰবৎ বৃত্তমুখী ও তুমি রণপ্ৰিয়া, তোমাকে নমস্কার ॥
উমে শাকম্বরী শ্বেতে কৃষ্ণে কৈটভনাশিনি ।
হিরণ্যাক্ষি বিরূপাক্ষি সুধূম্রাক্ষি নমোঽস্তু তে ॥ ৬॥

ভাবার্থঃ- হে উমে ! হে শাকম্ভরি ! হে মহেশ্বরীরূপে শ্বেতে ! হে কৃষ্ণে ! তুমি মধুকৈটভনাশিনী, তুমি পীতনেত্ৰা বিবিধ মনুষ্যরূপে বিরূপাক্ষী ও মার্জারাদিরূপে সুধূম্রাক্ষী, তোমাকে নমস্কার ॥
বেদশ্রুতি মহাপুণ্যে ব্রহ্মণ্যে জাতবেদসি ।
জম্বূকটকচৈত্যেষু নিত্যম্ সন্নিহিতালয়ে ॥ ৭॥
ত্বং ব্রহ্মবিদ্যাবিদ্যানাং মহানিদ্রা চ দেহিনাম্ ।
স্কন্দমাতর্ভগবতি দুর্গে কান্তারবাসিনি ॥ ৮॥
স্বাহাকারঃ স্বধা চৈব কলা কাষ্ঠা সরস্বতী ।
সাবিত্রী বেদমাতা চ তথা বেদান্ত উচ্যতে ॥ ৯॥
স্তুতাসি ত্বং মহাদেবি বিশুদ্ধেনান্তরাত্মনা ।
জয়ো ভবতু মে নিত্যং ত্বত্প্রসাদাদ্রণাজিরে ॥ ১০॥

ভাবার্থঃ- হে বেদশ্ৰুতি মহাপুণ্য স্বরূপিণি। হে ব্ৰহ্মণ্য দেবি ! হে অতীতজ্ঞে ! জম্বুদ্বীপ রাজধানী ও দেবালয় তোমার নিত্য সন্নিহিত স্থান। তুমি বিদ্যাসকলের মধ্যে ব্ৰহ্মবিদ্যা এবং শরীরীদিগের মধ্যে মহানিদ্রা (অর্থাৎ ব্ৰহ্মবিদ্যার ফলভূত মুক্তি) তুমি কাৰ্ত্তিকেয় জননী, ভগবতী, দুৰ্গা ও কান্তারবাসিনী, তুমি স্বাহা, স্বধা, কলা, কাষ্ঠা, সরস্বতী, সাবিত্রী, বেদমাতা ও বেদান্তরূপিণী উক্ত হইতেছে। হে মহাদেবি! আমি বিশুদ্ধচিত্তে তোমাকে স্তব করিতেছি ; তোমার প্রসাদে যুদ্ধাঙ্গনে আমার নিত্য জয় হউক ৷৷
কান্তারভয়দুর্গেষু ভক্তানাং চালয়েষু চ ।
নিত্যং বসসি পাতালে য়ুদ্ধে জয়সি দানবান্ ॥ ১১॥

ভাবার্থঃ-কান্তারে, ভয়স্থলে, দুৰ্গে, ভক্তদিগের আলয়ে ও পাতালে তুমি সর্বদা বাস করিয়া থাক এবং যুদ্ধে দানবগণকে পরাজিত কর।
ত্বং জম্ভনী মোহিনী চ মায়া হ্রীঃ শ্রীস্তথৈব চ ।
সন্ধ্যা প্রভাবতী চৈব সাবিত্রী জননী তথা ॥ ১২॥
তুষ্টিঃ পুষ্টির্ধৃতির্দীপ্তিশ্চন্দ্রাদিত্যবিবর্ধিনী ।
ভূতির্ভূতিমতাং সঙ্খ্যে বীক্ষ্যসে সিদ্ধচারণৈঃ ॥ ১৩॥

ভাবার্থঃ-তুমি জম্ভিনী (তন্দ্রা), মোহিনী (নিদ্রা ), মায়া (অদ্ভূতদর্শন) তুমি হ্রী ( লজ্জা নামিকা চিত্তবৃত্তি-ইহাতে কামাদি বৃত্তির কথাও রহিল ) শ্ৰী, তুমি সন্ধ্যা, প্ৰভাবতী ও সাবিত্রী জননী। তুমি তুষ্টি, পুষ্টি, ধৃতি, দীপ্তি ও চন্দ্ৰসূৰ্য্যবৰ্দ্ধিনী (অত্যন্ত কান্তিমতী) এবং তুমি ভূতিমানদিগের গৃহে সম্পাৎস্বরূপ এবং সিদ্ধচারণগণের তত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানগম্য হইয়া থাক।
ফলশ্রুতি -
য়ঃ ইদং পঠতে স্তোত্রং কল্য উত্থায় মানবঃ ।
য়ক্ষরক্ষঃপিশাচেভ্যো ন ভয়ং বিদ্যতে সদা ॥ ১॥
ন চাপি রিপবস্তেভ্যঃ সর্পাদ্যা য়ে চ দংষ্ট্রিণঃ ।
ন ভয়ং বিদ্যতে তস্য সদা রাজকুলাদপি ॥ ২॥
বিবাদে জয়মাপ্নোতি বদ্ধো মুচ্যেত বন্ধনাত্ ।
দুর্গং তরতি চাবশ্যং তথা চোরৈর্বিমুচ্যতে ॥ ৩॥
সঙ্গ্রামে বিজয়েন্নিত্যং লক্ষ্মীং প্রাপ্নোতি কেবলাম্ ।
আরোগ্যবলসম্পন্নো জীবেদ্ বর্ষশতং তথা ॥ ৪॥

ভাবার্থঃ-যে মানব প্ৰত্যুষে উথ্থিত হইয়া এই স্তোত্রপাঠ করে, তাহার কদাচ যক্ষ, রাক্ষস ও পিশাচ হইতে ভয় থাকে না এবং তাহার শত্রু ভয়ও থাকে না, এবং দংষ্ট্রী ও সর্পাদি হিংস্ৰজীব হইতে ও রাজকুল হইতে তাহার ভয় থাকে না । সে ব্যক্তি অবশ্যই বিবাদে জয়লাভ করে, বন্ধন হইতে মুক্ত হয়। দুর্গ হইতে অবশ্যই উত্তীর্ণ হয়, চোর ভয় তাহার থাকে না ; সংগ্রামে নিশ্চলা লক্ষ্মী তাহাকে আশ্রয় করিয়া থাকেন, এবং সে আরোগ্য ও বলশালী হইয়া শতবর্ষ জীবিত থাকে ॥

ইতি শ্ৰীদুৰ্গা স্ত্ৰোত্ৰম্।

দেবী পরমা ব্রহ্মবিদ্যা ও বেদত্রয়রূপাঃ-


শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর শক্রাদিস্তুতির্নাম চতুর্থোঽধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
যা মুক্তিহেতুরবিচিন্ত্যমহাব্রতা ত্বং
অভ্যস্যসে সুনিয়তেন্দ্রিয়তত্ত্বসারৈঃ .
মোক্ষার্থিভির্মুনিভিরস্তসমস্তদোষৈ-
র্বিদ্যাসি সা ভগবতী পরমা হি দেবি .. ৯..

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- হে দেবি, যে পরাবিদ্যা মুক্তির হেতু, যোগশাস্ত্রোক্ত দুরনুষ্ঠেয় যমনিয়মাদি মহাব্রত যাঁহার সাধন, সেই পরমা ব্রহ্মবিদ্যা ভগবতী তুমিই। এইজন্য জিতেন্দ্রিয়, তত্ত্বনিষ্ঠ, শুদ্ধচিত্ত ও মুমুক্ষু মুনিগণ কর্তৃক তুমি ব্রহ্মবিদ্যারূপে অভ্যাসের বিষয়ীভূতা হন।

শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর শক্রাদিস্তুতির্নাম চতুর্থোঽধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
শব্দাত্মিকা সুবিমলগ্যর্জুষাং নিধান-
মুদ্গীথরম্যপদপাঠবতাং চ সাম্নাম্ .
দেবী ত্রয়ী ভগবতী ভবভাবনায়
বার্তা চ সর্বজগতাং পরমার্তিহন্ত্রী .. ১০..

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- দেবি, তুমি শব্দস্বরূপা অর্থাৎ নাদব্রহ্মরূপা, তুমি বিশুদ্ধ (কারণ অপৌরুষেয়) ঋক্ যজুঃ মন্ত্রসমূহের এবং উদগীত অর্থাৎ উদাত্তাদি স্বর ও মধুর পদোচ্চারণবিশিষ্ট সামমন্ত্রসকলের আশ্রয়স্বরূপা। তুমি ত্রয়ী অর্থাৎ ঋগ্বেদ,যজুর্বেদ ও সামবেদ ত্রয়রূপা ভগবতী অর্থাৎ সর্বৈশ্বর্যময়ী। তুমি ভব ভাবনায় অর্থাৎ জগৎ পরিপালনের নিমিত্ত কৃষি. পশুপালন ও বাণিজ্যাদি বৃত্তিস্বরূপা এবং সমস্ত জগতের পরম আর্তি হন্ত্রী অর্থাৎ অশেষ দুঃখহারিণী।

বিশ্বেশ্বর্যাদি সূক্ত বা তান্ত্রিক রাত্রিসূক্তঃ-


বিশ্বেশ্বর্যাদি সূক্ত ব্রহ্মা কর্তৃক দৃষ্ট। উহাতে কালরাত্রি মোহরাত্রি আদি শব্দের উল্লেখ থাকায় উহাকে তান্ত্রিক রাত্রিসূক্ত বলে। লক্ষ্মীতন্ত্রে বর্ণিত আছে-'বিশ্বশ্বরী ইত্যাদি সূক্ত তখন ব্রহ্মা কর্তৃক দৃষ্ট হয়। ইন্দ্রের ন্যায় ব্রহ্মাও দেবী যোগনিদ্রার স্তব করিয়াছিলেন। সকল প্রাণীর কল্যাণের নিমিত্ত ব্রহ্মবাদিগণ এই দেবীর আবির্ভাব, চরিত্র ও স্তোত্র বিধান করেন।'
শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণে দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর মধুকৈটভবধো নাম প্রথমোঽধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
ॐ বিশ্বেশ্বরীং জগদ্ধাত্রীং স্থিতিসংহারকারিণীম্ .
নিদ্রাং ভগবতীং বিষ্ণোরতুলাং তেজসঃ প্রভুঃ .. ৭১..

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- ভগবান বিষ্ণুর জাগরণের নিমিত্ত তেজঃস্বরূপ বিষ্ণুর নয়নাশ্রিতা অতুলা তামসী শক্তি বিশ্বেশ্বরী, জগদ্ধাত্রী, স্থিতি-সংহারকারিণী, ভগবতী সেই যোগনিদ্রার স্তব করিতে লাগিলেন।
ব্যাখ্যাঃ-প্রথম চরিত্রের দেবতা তমোগুণ-প্রধানা মহাকালীই যোগনিদ্রা। ইনিই মহামায়া। গুপ্তবতীটীকা মতে চণ্ডীর তিনটি মাহাত্ম্যে দেবীর তিনটি বিভিন্নস্বরূপ বর্ণিত হইলেও ইঁহারা এক মহামায়ারই পৃথক প্রকাশ মাত্র।
ব্রহ্মোবাচ .. ৭২..
ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্কারঃ স্বরাত্মিকা । ৭৩
সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-ব্রহ্মা বলিলেন- নিত্যে, অক্ষরে, আপনিই দেবদ্দেশ্যে হবির্দানের স্বাহামন্ত্ররূপা। আপনিই পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে দ্রব্যদানের স্বধামন্ত্ররূপা।আপনিই দেবাহ্বানের বষট্মন্ত্রস্বরূপা ও উদাত্তাদিস্বররূপা। আপনিই অমৃতরূপা এবং অ-উ-ম ত্রিবিধ মাত্রারূপে অবস্থিতা প্রণবরূপা।
অর্ধমাত্রা স্থিতা নিত্যা যানুচ্চার্যা বিশেষতঃ । ৭৪
ত্বমেব সা ত্বং সাবিত্রী ত্বং দেবজননী পরা ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-বিশেষরূপে যাহা অনুচ্চার্যা নির্গুণা বা তুরীয়া, তাহাও আপনি। হে দেবী, আপনি গায়ত্রিমন্ত্ররূপা এবং পরিণামহীনা শ্রেষ্ঠা শক্তি ও দেবগণের আদি মাতা।
ত্বয়ৈব ধার্যতে সর্বং ত্বয়ৈতৎ সৃজ্যতে জগৎ । ৭৫
ত্বয়ৈতৎ পাল্যতে দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-হে দেবী, আপনিই এই জগৎ ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। আপনি এই জগৎ সৃষ্টি করেন, আপনিই ইহা পালন করেন এবং সর্বদা প্রলয়কালে আপনিই ইহা সংহার করেন।
বিসৃষ্টৌ সৃষ্টিরূপা ত্বং স্থিতিরূপা চ পালনে । ৭৬
তথা সংহৃতিরূপান্তে জগতোঽস্য জগন্ময়ে ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-হে জগৎস্বরূপা, আপনি এই জগতের সৃষ্টিকালে সৃষ্টিশক্তিস্বরূপা, পালনকালে স্থিতিশক্তিস্বরূপা এবং প্রলয়কালে সংহারশক্তিস্বরূপা।
মহাবিদ্যা মহামায়া মহামেধা মহাস্মৃতিঃ । ৭৭
মহামোহা চ ভবতী মহাদেবী মহাসুরী ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-আপনি মহাবাক্যলক্ষণা ব্রহ্মবিদ্যা ও সংসৃতিকর্ত্রী মহামায়া। আপনি মহতী মেধা (ধারণা), মহতী স্মৃতি ও মহামোহ। আপনি মহতী দেবশক্তি এবং মহতী অসুরশক্তি।
প্রকৃতিস্ত্বং হি সর্বস্য গুণত্রয়বিভাবিনী । ৭৮
কালরাত্রির্মহারাত্রির্মোহরাত্রিশ্চ দারুণা ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-আপনিই সর্বভূতের প্রকৃতি ও ত্রিগুণের পরিণাম বিধায়িনী। আপনি কালরাত্রি (যাহাতে ব্রহ্মার লয় হয়) ও মহারাত্রি (যাহাতে জগতের লয় হয়)। আপনি দুষ্পরিহারা মহামোহনিশা বা মানুষী রাত্রি (যাহাতে জীবের নিত্য লয় হয়)।
ত্বং শ্রীস্ত্বমীশ্বরী ত্বং হ্রীস্ত্বং বুদ্ধির্বোধলক্ষণা । ৭৯
লজ্জা পুষ্টিস্তথা তুষ্টিস্ত্বং শান্তিঃ ক্ষান্তিরেব চ ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-আপনি লক্ষ্মী, আপনি ঈশ্বরশক্তি, আপনি হ্রী, আপনি নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি। আপনি লজ্জা, পুষ্টি এবং তুষ্টি। আপনিই শান্তি ও ক্ষান্তি।
খড়্গিনী শূলিনী ঘোরা গদিনী চক্রিণী তথা । ৮০
শঙ্খিনী চাপিনী বাণভুসণ্ডীপরিঘায়ুধা ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-আপনি খড়্গধারিণী, ত্রিশূলধারিণী, (এক হস্ত নরশির ধারণে) ভয়ঙ্করী, গদাধারিণী, চক্রধারিণী, শঙ্খধারিণী, ধনুর্ধারিণী এবং বাণ, ভূশণ্ডী ও পরিঘাস্ত্রধারিণী।
সৌম্যাসৌম্যতরাশেষসৌম্যেভ্যস্ত্বতিসুন্দরী । ৮১
পরা পরাণাং পরমা ত্বমেব পরমেশ্বরী ।।

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-আপনি দেবগণের প্রতি সৌম্যা এবং দৈত্যগণের প্রতি ততোধিক রুদ্রা। আপনি সকল সুন্দর বস্তু অপেক্ষাও সুন্দরী। আপনি ব্রহ্মাদিরও শ্রেষ্ঠ। আপনি সর্বপ্রধানা দেবী এবং পরমেশ্বরের মহাশক্তি।
যচ্চ কিঞ্চিত্ক্বচিদ্বস্তু সদসদ্বাখিলাত্মিকে .
তস্য সর্বস্য যা শক্তিঃ সা ত্বং কিং স্তূয়সে ময়া .. ৮২..


নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- হে বিশ্বরূপিণী, যেকোনও স্থানে যাহা কিছু চেতন বা জড় বস্তু অতীতে ছিলে, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে হইবে সেই সকলের যে শক্তি, তাহা আপনিই। সুতরাং কিরূপে আপনার স্তব করিব?

অপরাজিতা স্তব বা তান্ত্রিক দেবীসূক্তম্ঃ-

তন্ত্রমতে ইহাই দেবীসূক্ত। ইহাকে 'অপরাজিতা স্তব' বলে। লক্ষ্মীতন্ত্রে আছে এই দেবীসূক্ত সর্ব্বফলদায়ক। এই সূক্ত দ্বারা নিত্য দেবীর স্তব করিলে মনুষ্য সকল ক্লেশ অতিক্রম করিয়া মহৈশ্বর্য্য লাভ করেন।শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর দেব্যাদূতসংবাদ নামক পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত বর্ণিত আছে-

                                    দেবা ঊচুঃ .. ৮..
নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ ।
নমঃ প্রকৃতৈ ভদ্রায়ৈ নিয়তাঃ প্রণতাঃ স্ম তাম্ ।। ৯

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- মহামায়াকে দেবগণ এইরূপ স্তব করিলেন- দেবীকে, মহাদেবীকে প্রণাম। সতত মঙ্গলদায়িনীকে প্রণাম। সৃষ্টিশক্তিরূপিণী প্রকৃতিকে প্রণাম। স্থিতিশক্তিরূপিণী ভদ্রাকে প্রণাম। আমরা সমাহিত চিত্তে তাঁহাকে বার বার প্রণাম করি।
রৌদ্রায়ৈ নমো নিত্যায়ৈ গৌর্যৈ ধাত্র্যৈ নমো নমঃ ।
জ্যোৎস্নায়ৈ চেন্দুরূপিণ্যৈ সুখায়ৈ সততং নমঃ ।। ১০

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- রৌদ্রাকে (সংহারশক্তিকে) প্রণাম। নিত্যাকে (ত্রিকালাতীত সত্তারূপিণীকে) প্রণাম। গৌরী জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম। জ্যোৎস্নারূপা, চন্দ্ররূপা ও সুখস্বরূপাকে সতত প্রণাম।
কল্যাণ্যৈ প্রণতা বৃদ্ধ্যৈ সিদ্ধ্যৈ কুর্মো নমো নমঃ ।
নৈঋত্যৈ ভুভৃতাং লক্ষ্ম্যৈ শর্বাণ্যৈ তে নমো নমঃ ।। ১১

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- কল্যাণীকে প্রণাম করি। বৃদ্ধিরূপা ও সিদ্ধিরূপাকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করি।অলক্ষ্মীরূপা, ভূপতিগণের লক্ষ্মীরূপা শর্বাণী আপনাকে বার বার প্রণাম করি।
দুর্গায়ৈ দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বকারিণ্যৈ ।
খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্রায়ৈ সততং নমঃ ।। ১২

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- দুস্তর-ভবসমুদ্র-পার-কারিণী, শক্তিরূপিণী, সৃষ্টিকর্ত্রী, খ্যাতি (বা প্রকৃতি-পুরুষের ভেদ বা প্রসিদ্ধি)-রূপিণী কৃষ্ণবর্ণা ও ধূম্রবর্ণা দুর্গাদেবীকে সতত প্রণাম করি।
ব্যাখ্যাঃ-তত্ত্বপ্রকাশিকা টীকা অনুসারে-পাঁচপ্রকার খ্যাতি বা দার্শনিক মতবাদ আছে। যথা-বিজ্ঞানবাদের আত্মখ্যাতি, শূন্যবাদের অসৎখ্যাতি, মীমাংসার অখ্যাতি, ন্যায়ের অন্যথাখ্যাতি এবং অদ্বৈতবেদান্তের অনির্বচনীয় খ্যাতি। শ্রীভগবান্ শ্রীমদ্ভাগবতের ১১শ স্কন্ধে উদ্ভবকে বলিতেছেন যে, তিনি খ্যাতিবাদিগণের বিকল্পস্বরূপ।
অতিসৌম্যাতিরৌদ্রায়ৈ নতাস্তস্যৈ নমো নমঃ ।
নমো জগৎপ্রতিষ্ঠায়ৈ দেব্যৈ কৃত্যৈ নমো নমঃ ।। ১৩

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যিনি বিদ্যারূপে অতি সৌম্যা এবং অবিদ্যারূপে অতি রৌদ্রা (অতি ভীষণা) তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম। জগতের আশ্রয়রূপিণীকে প্রণাম। ক্রিয়ারূপিণী দেবীকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম।
যা দেবী সর্বভূতেষু বিষ্ণুমায়েতি শব্দিতা ।
নমস্তস্যৈ (১৪) নমস্তস্যৈ (১৫) নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ১৬

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সকল প্রাণীতে বিষ্ণুমায়া নামে (আগমশাস্ত্রে) অভিহিতা হন, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
ব্যাখ্যাঃ-গুপ্তবতী টীকা অনুসারে-বরাহপুরাণমতে যে শক্তি মেঘ, বৃষ্টি, শস্যের উৎপত্তি প্রভৃতি কার্য্য সম্পন্ন করেন তিনিই বিষ্ণুমায়া। বিষ্ণুমায়া, যোগমায়া ও মহামায়া চণ্ডিকার ভিন্ন নাম।
যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ১৭-১৯

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে চেতনারূপে অর্থাৎ জ্ঞানাত্মিকা অন্তঃকরণবৃত্তিরূপে প্রসিদ্ধা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
ব্যাখ্যাঃ- চেতনারূপে প্রসিদ্ধা ইহার অর্থ গুপ্তবতী টীকা অনুসারে 'জীব-নাড়ী' আর চতুর্ধরী টীকা অনুসারে 'অন্তঃকরণবৃত্তি'।
যা দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ২০-২২

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে বুদ্ধিরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ২৩-২৫

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে নিদ্রারূপে বিরাজিতা তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ২৬-২৮

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে ক্ষুধারূপে অবস্থিতা তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু ছায়ারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ২৯-৩১

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বপ্রাণীতে ছায়ারূপে বিরাজমানা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৩২-৩৪

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বপ্রাণীতে শক্তিরূপে অধিষ্ঠিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৩৫-৩৭

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে তৃষ্ণা (বিষয়-বাসনা)-রূপে সংস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৩৮-৪০

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে ক্ষমারূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু জাতিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৪১-৪৩

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ- যে দেবী সর্বভূতে জাতিরূপে অর্থাৎ গোত্ব-মনুষ্যত্বাদি জাতিরূপে সংস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
ব্যাখ্যাঃ- জাতিরূপে বিষয়ে গুপ্তবতীটীকা মতে 'জন্ম বা ব্রহ্মসত্তা'।
যা দেবী সর্বভূতেষু লজ্জারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৪৪-৪৬

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বভূতে লজ্জারূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৪৭-৪৯

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে শান্তিরূপে সংস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু শ্রদ্ধারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৫০-৫২

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বভূতে শ্রদ্ধারূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু কান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৫৩-৫৫

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে কান্তিরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৫৬-৫৮

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে লক্ষ্মীরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু বৃত্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৫৯-৬১

যে দেবী সর্বভূতে (কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্যাদি) বৃত্তি (জীবিকা)-রূপে সংস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু স্মৃতিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৬২-৬৪

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বভূতে স্মৃতিরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু দয়ারূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৬৫-৬৭

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে দয়ারূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু তুষ্টিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৬৮-৭০

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বভূতে সন্তোষরূপে অর্থাৎ যথালাভে তুষ্টিরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৭১-৭৩

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে মাতৃরূপে অর্থাৎ ব্রাহ্মী আদি অষ্টমাতৃকা বা মাতৃকা নাম্নী বর্ণদেবতা জননীরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
ব্যাখ্যাঃ- মাতৃরূপে বিষয়ে গুপ্তবতী টীকামতে 'প্রমাতা'।
যা দেবী সর্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৭৪-৭৬

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যে দেবী সর্বপ্রাণীতে ভ্রান্তিরূপে অর্থাৎ যাহা যাহা নয়, তাহাকে তাহা মনে করা রূপ মিথ্যাজ্ঞানরূপে অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
ব্যাখ্যাঃ- গুপ্তবতীটীকা মতে ভ্রান্তি অর্থাৎ 'অপ্রমা'।
ইন্দ্রিয়াণামধিষ্ঠাত্রী ভূতনাঞ্চাখিলেষু যা।
ভূতেষু সততং তস্যৈ ব্যাপ্তিদেব্যৈ নমো নমঃ ।। ৭৭

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যিনি সকল প্রাণীতে চতুর্দশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতারূপে বিরাজিতা এবং যিনি পৃথিবী আদি পঞ্চ স্থূল ও পঞ্চ সূক্ষ্ম ভূতের প্রেরয়ত্রী, সেই বিশ্বব্যাপিকা ব্রহ্মশক্তিরূপা দেবীকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম।
ব্যাখ্যাঃ- চতুর্দশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতারূপে বিরাজিতা বিষয়ে টীকা হইল-কর্ণ, ত্বক, চক্ষু, জিহ্বা ও নাসিকা এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা যথাক্রমে দিক্, বায়ু, সূর্য, বরুণ ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়। বাক্, পাণি বা হস্ত, পাদ, পায়ু ও উপস্থ বা জননেন্দ্রিয় এই পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা যথাক্রমে অগ্নি, ইন্দ্র, বিষ্ণু, যম ও প্রজাপতি। মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত-এই চারি অন্তরিন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা যথাক্রমে চন্দ্র, ব্রহ্মা, শঙ্কর ও অচ্যুত।
চিতিরূপেণ যা কৃৎস্নমেতদ্ ব্যাপ্যা স্থিতা জগৎ ।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ।। ৭৮-৮০

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-যিনি চিৎশক্তিরূপে এই সমগ্র জগৎ ব্যাপিয়া অবস্থিতা, তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার। তাঁহাকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।