Saturday, 11 April 2026

'মহালক্ষ্মীস্তোত্রম্' (বিষ্ণুপুরাণান্তর্গত)—

 


শ্রীপরাশর উবাচ

সিংহাসনগতঃ শক্রস্সম্প্রাপ্য ত্রিদিবং পুনঃ

দেবরাজ্যে স্থিতো দেবীং তুষ্টাবাব্জকরাং ততঃ ১॥

পরাশর কহিলেনতদনন্তর ইন্দ্র পুনর্ব্বার ত্রিদিব (স্বর্গ) প্রাপ্ত হওয়ায় দেবরাজ্যে স্থিত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়া পদ্মহস্তা দেবীকে (লক্ষ্মীকে) স্তব করিয়াছিলেন।

ইন্দ্র উবাচ

নমস্যে সর্বভূতানাং জননীমব্জসম্ভবাম্

শ্রিয়মুন্নিদ্রপদ্মাক্ষীং বিষ্ণুবক্ষঃস্থলস্থিতাম্ ২॥

ইন্দ্র বলিলেনসর্ব্বভূতের জননী, অব্জসম্ভবা (কমলোদ্ভবা), বিকসিত পদ্মলোচনা, বিষ্ণুর বক্ষঃস্থলস্থিতা লক্ষ্মীকে নমস্কার।

ত্বং সিদ্ধিস্ত্বং স্বধা স্বাহা সুধা ত্বং লোকপাবনী

সন্ধ্যা রাত্রিঃ প্রভা ভূতির্মেধা শ্রদ্ধা সরস্বতী

অয়ি লোকপাবনি! তুমি সিদ্ধি, তুমি সুধা, তুমি স্বাহা, স্বধা, সন্ধ্যা, রাত্রি, প্রভা, ভূতি (বিভূতি), মেধা, শ্রদ্ধা সরস্বতী।

যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা শোভনে

আত্মবিদ্যা দেবি ত্বং বিমুক্তিফলদায়িনী

অয়ি শোভনে দেবি! তুমি যজ্ঞবিদ্যা, মহাবিদ্যা, গুহ্যবিদ্যা এবং বিমুক্তি-ফলদায়িনী আত্মবিদ্যা।

আন্বীক্ষিকী ত্রয়ী বার্তা দণ্ডনীতিস্ত্বমেব

সৌম্যাসৌম্যৈর্জগদ্রূপৈস্ত্বয়ৈতদ্দেবি পূরিতম্

তুমিই তর্কবিদ্যা, ত্রয়ী (ঋক্, যজুঃ সামবিদ্যা), বার্তা (সংবাদ) দণ্ডনীতি। হে দেবি! তোমারই সৌম্যাসৌম্যরূপে এই জগৎ পূরিত (পরিপূর্ণ)

কা ত্বন্যা ত্বামৃতে দেবি সর্বযজ্ঞময়ং বপুঃ

অধ্যাস্তে দেবদেবস্য যোগচিন্ত্যং গদাভৃতঃ

দেবি! তোমা ভিন্ন অন্য কোন্ স্ত্রী যোগিগণের ধ্যেয় সেই গদাধর দেবদেবের (ভগবান্ বিষ্ণুর) সর্ব্বযজ্ঞময় শরীরে বাস করিতে পারে?

ত্বয়া দেবি পরিত্যক্তং সকলং ভুবনত্রয়ম্

বিনষ্টপ্রায়মভবত্ত্বয়েদানীং সমেধিতম্

হে দেবি! তুমি পরিত্যাগ করায় সকল ভুবনত্রয় বিনষ্টপ্রায় হইয়াছিল। ইদানীং তোমা দ্বারাই সংবর্দ্ধিত হইল।

দারাঃ পুত্রাস্তথাঽঽগারসুহৃদ্ধান্যধনাদিকম্

ভবত্যেতন্মহাভাগে নিত্যং ত্বদ্বীক্ষণান্নৃণাম্

অয়ি মহাভাগে! তোমার দৃষ্টিমাত্রে মনুষ্যদিগের স্ত্রী, পুত্র, গৃহ, সুহৃদ ধনধান্যাদি লাভ হইয়া থাকে।

শরীরারোগ্যমৈশ্বর্যমরিপক্ষক্ষয়ঃ সুখম্

দেবি ত্বদ্দৃষ্টিদৃষ্টানাং পুরুষাণাং দুর্লভম্

দেবি! তোমার দৃষ্টিদৃষ্ট পুরুষদিগের পক্ষে শরীরের আরোগ্য, ঐশ্বর্য্য, সুখ শত্রুপক্ষের বিনাশ কিছুই দুর্লভ নহে।

ত্বমম্বা সর্বভূতানাং দেবদেবো হরিঃ পিতা

ত্বয়ৈতদ্বিষ্ণুনা চাম্ব জগদ্ব্যাপ্তং চরাচরম্ ১০॥

তুমিই সর্ব্বভূতের মাতা আর দেবদেব শ্রীহরি হইল পিতা; তোমাদের উভয়ের দ্বারাই এই চরাচর জগৎ ব্যাপ্ত। ১০

মা নঃ কোশস্তথা গোষ্ঠং মা গৃহং মা পরিচ্ছদম্

মা শরীরং কলত্রং ত্যজেথাঃ সর্বপাবনি ১১

অয়ি সর্ব্ব-পাবনি! তুমি আমাদের কোশ (ধনভাণ্ডার), গোষ্ঠ (গোস্থান), গৃহ, পরিচ্ছদ (বস্ত্র), শরীর কলত্র (পত্নী) ত্যাগ করিও না।

মা পুত্রান্মা সুহৃদ্বর্গান্মা পশূন্মা বিভূষণম্

ত্যজেথা মম দেবস্য বিষ্ণোর্বক্ষঃস্থলাশ্রয়ে ১২

অয়ি বিষ্ণুবক্ষঃস্থলাশ্রয়ে! আমার পুত্রগণ, সুহৃদ্বর্গ, পশু বিভূষণ (অলঙ্কার) সকল ত্যাগ করিও না। ১২

সত্ত্বেন সত্যশৌচাভ্যাং তথা শীলাদিভির্গুণৈঃ

ত্যজ্যন্তে তে নরাঃ সদ্যঃ সন্ত্যক্তা যে ত্বয়াঽমলে ১৩॥

অয়ি অমলে! তুমি যাহাদিগকে ত্যাগ কর, তাহাদিগকে সত্ত্ব, সত্য, শৌচ শীলাদি গুণ সকলই ত্যাগ করে। ১৩

ত্বয়াঽবলোকিতাঃ সদ্যঃ শীলাদ্যৈরখিলৈর্গুণৈঃ

কুলৈশ্বর্যৈশ্চ পূজ্যন্তে পুরুষা নির্গুণা অপি ১৪॥

তুমি অবলোকন করিলে নির্গুণ পুরুষেরাও সদ্য শীলাদি অখিল গুণ, কুল ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন হয়। ১৪

শ্লাঘ্যঃ গুণী ধন্যঃ কুলীনঃ বুদ্ধিমান্

শূরঃ বিক্রান্তো যস্ত্বয়া দেবি বীক্ষিতঃ ১৫॥

হে দেবি! তুমি যাহাকে নিরীক্ষণ কর, সে শ্লাঘ্য (প্রশংসনীয়),  সে গুণী, সে ধন্য, সে কুলীন, সে বুদ্ধিমান্, সে শূর (বীর) এবং বিক্রান্ত (বিক্রমশালী) ১৫

সদ্যো বৈগুণ্যমায়ান্তি শীলাদ্যাঃ সকলা গুণাঃ

পরাঙ্গমুখী জগদ্ধাত্রী যস্য ত্বং বিষ্ণুবল্লভে ১৬

অয়ি জগদ্ধাত্রি বিষ্ণুবল্লভে! তুমি যাহার প্রতি পরাঙ্মুখী হও, তাহার শীলাদি সকল গুণ সদ্যঃই বৈগুণ্য প্রাপ্ত হয়। ১৬

তে বর্ণয়িতুং শক্তা গুণাঞ্জিহ্বাঽপি বেধসঃ

প্রসীদ দেবি পদ্মাক্ষি মাঽস্মাংস্ত্যাক্ষীঃ কদাচন ১৭॥

হে পদ্মাক্ষি দেবি! ব্রহ্মার জিহ্বাও তোমার গুণ বর্ণন করিতে অশক্ত (অক্ষম),  আমাদিগকে কদাচ ত্যাগ করিও না।১৭

ইতি শ্রীবিষ্ণুপুরাণে মহালক্ষ্মী স্তোত্রং সম্পূর্ণম্

—(বিষ্ণুপুরাণ, প্রথমাংশ, নবম অধ্যায়, ১১৫-১৩১)

তথ্যসূত্রঃ- মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস প্রণীত 'বিষ্ণুপুরাণম্', আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স।

শ্রীশুভ চৌধুরী

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।

মহামায়ার নির্গুণ তুরীয় স্বরূপের কথনঃ-

 


যে গুণাতীত নিত্য মঙ্গলময়ী শক্তি সর্বদা সকল স্থানেই অখণ্ড অবিকৃতরূপে বিরাজমান আছেন; যোগেন্দ্র পুরুষগণ যাঁকে সমাধিকালে নিজ আত্মমন্দিরে তুরীয় চৈতন্যরূপে অনুভব করতঃ চরিতার্থতা লাভ করেন, তাঁরই সত্ত্ব অংশে সরস্বতী, রজঃ অংশে মহালক্ষ্মী আর তমঃ অংশে মহাকালী এই তিনটি অসীম ঐশ্বর্যশালিনী অনুপম রমণীমূর্তির আবির্ভাব হয়। দেবীভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে

নির্গুণা যা সদা নিত্যা ব্যাপিকা বিকৃতা শিবা

যোগগম্যাঽখিলাধারা তুরীয়া যা সংস্থিতা

তস্যাস্তু সাত্ত্বিকী শক্তী রাজসী তামসী তথা

মহালক্ষ্মীঃ সরস্বতী মহাকালীতি তাঃ স্ত্রিয়ঃ

-(দেবীভাগবত-১।২।১৯-২০)

যিনি সদা নির্গুণা, নিত্যা, ব্যাপিকা, অপরিণামিনী শিবা (মঙ্গলরূপিণী) এবং যিনি ধ্যানগম্যা, বিশ্বাধারা তুরীয়ারূপে সংস্থিতা, তাঁর সাত্ত্বিকী, রাজসী তামসী শক্তিই যথাক্রমে মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী মহাকালী।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য মহামায়ার গুণত্রয়াতীত তুরীয় স্বরূপের কথা স্পষ্টতঃই সৌন্দর্যলহরীতে বর্ণনা করেছেন

গিরামাহুর্দেবীং দ্রুহিণগৃহিণীমাগমবিদো

হরেঃ পত্নীং পদ্মাং হরসহচরীমদ্রিতনয়াম্

তুরীয়া কাপি ত্বং দুরধিগমনিঃসীমমহিমা

মহামায়া বিশ্বং ভ্রময়সি পরব্রহ্মমহিষি ৯৭॥

হে পরব্রহ্মমহিষি! আগমবিদ্গণ ব্রহ্মার পত্নীকে বাগদেবী; বিষ্ণুর পত্নীকে লক্ষ্মী এবং পর্বত-তনয়া দুর্গাকে মহেশ্বরের সহচরী বলে নির্দেশ করে থাকেন। হে মহামায়া! এই শক্তিত্রয় হতে অতিরিক্তা গুণত্রয়াতীতা চতুর্থা তুমি কে? আমরা তা নিরূপণ করতে সমর্থ নই। তোমার দুরধিগম্য মহিমার সীমা নিরূপিত হয় না। তুমি এই ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডলকে মোহিত করছ।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. শ্রীমদ্দেবীভাগবতম্ মহাপুরাণম্, শৈবশ্রী নীলকণ্ঠ ভট্ট বিরচিত তিলকাখ্য টীকা সমেত।

. শিবাবতার শঙ্করাচার্যের গ্রন্থমালা, চারখণ্ড, আনন্দলহরী, অচ্যুতানন্দ লক্ষ্মীধরের টীকা সমেত, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর ১৮, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Tuesday, 30 August 2022

কৌশিকী

 


শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেব্যাদূতসংবাদো নাম পঞ্চমোঽধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

শরীরকোশাদ্যত্তস্যাঃ পার্বত্যা নিঃসৃতাম্বিকা .

কৌশিকীতি সমস্তেষু ততো লোকেষু গীয়তে .. ৮৭..

তস্যাং বিনির্গতায়াং তু কৃষ্ণাভূত্সাপি পার্বতী .

কালিকেতি সমাখ্যাতা হিমাচলকৃতাশ্রয়া .. ৮৮..

নাগোজীভট্টের টীকানুসারে বঙ্গানুবাদঃ-সেই পার্বতী দেবীর দেহ-কোষ হইতে অম্বিকা উৎপন্ন হইয়াছেন বলিয়া ত্রিজগতে তিনি কৌশিকী নামে অভিহিতা।৮৭

কৌশিকী দেবীর নির্গমনের পর পার্বতী দেবীও কৃষ্ণাবর্ণা হইয়া নিখিল দেবস্থান হিমালয়ে অধিষ্ঠান করিয়া কালিকা নামে প্রসিদ্ধা হইলেন।৮৮

Sunday, 15 August 2021

বৈদিক দেবীসূক্ত—



'অহম্' ইত্যাদি অষ্ট-মন্ত্রাত্মক ঋগ্বেদীয় দেবীসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি-অম্ভৃণ মহর্ষির কন্যা বাক্, দেবতা- পরব্রহ্মময়ী আদ্যাশক্তি, কেবল দ্বিতীয় মন্ত্রটি জগতী ছন্দে এবং অবশিষ্ট সপ্ত মন্ত্র ত্রিষ্টুপ্ ছন্দে নিবদ্ধ। শ্রীজগদম্বার প্রীতির নিমিত্ত সপ্তশতী চণ্ডীপাঠান্তে দেবীসূক্ত-পাঠের বিনিয়োগ হয়।

ঋগ্বেদ্ সংহিতা,১০ম মণ্ডল, ১০ম অনুবাক্‌, ১২৫ সূক্ত-

অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরাম্যহম্‌

আদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ ।

অহং মিত্রাবরুণোভা বিভর্ম্যহম্‌

ইন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিনোভা ।। ১

আমি একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, দ্বাদশ আদিত্য এবং বিশ্ব দেবতারূপে বিচরণ করি। আমি মিত্র ও বরুণ উভয়কে ধারণ করি। আমি ইন্দ্র ও অগ্নি এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে ধারণ করি।১

অহং সোমমাহনসং বিভর্ম্যহং

ত্বষ্টারমুত পূষণং ভগম্‌।

অহং দধামি দ্রবিণং হবিষ্মতে

সুপ্রাব্যে যজমানায় সুন্বতে ।। ২

আমি দেবশত্রুহন্তা সোমদেবকে, ত্বষ্টা-নামক দেবতাকে এবং পূষা ও ভগ (দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে দুইটি আদিত্য) নামক সূর্যদ্বয়কে ধারণ করি। উত্তম হবিঃযুক্ত, উপযুক্ত হবিঃ দ্বারা দেবগণের তৃপ্তিসাধনকারী এবং বিধিপূর্বক সোমরসপ্রস্তুতকারী যজমানের জন্য যজ্ঞফলরূপ ধনাদি আমিই বিধান করি।২

অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং

চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্‌ ।

তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা

ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশয়ন্তীম্‌ ।। ৩

আমিই সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, উপাসকগণের ধনপ্রদাত্রী, পরব্রহ্মকে আত্মারূপে সাক্ষাৎকারিণী। অতএব যজ্ঞার্হগণের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠা। আমি প্রপঞ্চরূপে বহুভাবে অবস্থিতা ও সর্বভুতে জীবরূপে প্রবিষ্টা। আমাকেই সর্বদেশে সুরনরাদি যজমানগণ বিবিধভাবে আরাধনা করে।৩

ময়া সো অন্নমত্তি যো বিপশ্যতি

যঃ প্রাণিতি য ঈং শৃণোত্যুক্তম্‌ ।

অমন্তবো মাং ত উপক্ষিয়ন্তি

শ্রুধি শ্রুত শ্রদ্ধিবং তে বদামি ।। ৪

আমারই শক্তিতে সকলে আহার ও দর্শন করে, শ্বাসপ্রশ্বাসাদি নির্বাহ করে এবং উক্ত বিষয় শ্রবণ করে। যাহারা আমাকে অন্তর্যামিনীরূপে জানে না, তাহারাই জন্মমরণাদি ক্লেশ প্রাপ্ত হয় বা সংসারে হীন হয়। হে কীর্তিমান সখা, আমি তোমাকে শ্রদ্ধালভ্য ব্রহ্মতত্ত্ব বলছি, শ্রবণ কর।৪

অহমেব স্বয়মিদং বদামি জুষ্টং

দেবেভিরুত মানুষেভিঃ ।

যং যং কাময়ে তং তমুগ্রং কৃণোমি

তং ব্রহ্মাণং তমৃষি তং সুমেধাম্‌ ।। ৫

দেবগণ ও মনুষ্যগণের প্রার্থিত ব্রহ্মতত্ত্ব আমি স্বয়ং উপদেশ করিতেছি। আমি ঈদৃশ ব্রহ্মস্বরূপিণী। আমি যাহাকে যাহাকে ইচ্ছা করি তাহাকে তাহাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ করি। আমি কাহাকে ব্রহ্মা করি, কাহাকে ঋষি করি এবং কাহাকেও বা অতি ব্রহ্মমেধাবান্‌ করি।৫

অহং রুদ্রায় ধনুরাতনোমি

ব্রহ্মদ্বিষে শরবে হন্তবা উ ।

অহং জনায় সমদং কৃণোম্যহং

দ্যাবাপৃথিবী আবিবেশ ।। ৬

ব্রাহ্মণবিদ্বেষী হিংস্র-প্রকৃতি ত্রিপুরাসুর-বধার্থ রুদ্রের ধনুকে আমিই জ্যা সংযুক্ত করি। ভক্তজনের কল্যাণার্থ আমিই যুদ্ধ করি এবং স্বর্গে ও পৃথিবীতে অন্তর্যামিনীরূপে আমিই প্রবেশ করিয়াছি।৬

অহং সুবে পিতরমস্য মূর্ধন্‌

মম যোনিরপ্‌স্বন্তঃ সমুদ্রে ।

ততো বিতিষ্ঠে ভুবনানু বিশ্বো-

তামূং দ্যাং বর্ষ্মণোপস্পৃশামি ।। ৭

আমিই সর্বাধার পরমাত্মার উপরে দ্যুলোককে প্রসব করিয়াছি। বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যস্থ যে ব্রহ্মচৈতন্য উহাই আমার অধিষ্ঠান। আমিই ভূরাদি সমস্ত লোক সর্বভূতে ব্রহ্মরূপে বিবিধভাবে বিরাজিতা। আমিই মায়াময় দেহ দ্বারা সমগ্র দ্যুলোক পরিব্যাপ্ত আছি।৭

অহমেব বাত ইব প্রবাম্যা-

রভমাণা ভুবনানি বিশ্বা ।

পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যৈ-

তাবতী মহিনা সংবভূব ।। ৮

আমিই ভূরাদি সমস্ত লোক সর্বভূত সৃষ্টি করিয়া বায়ুর মতো স্বচ্ছন্দে উহার অন্তরে বাহিরে সর্বত্র বিচরণ করি। যদিও স্বরূপতঃ আমি এই আকাশের অতীত অ পৃথিবীর অতীত অসঙ্গ-ব্রহ্মরূপিণী, তথাপি স্বীয় মহিমায় এই সমগ্র জগদ্‌-রূপ ধারণ করিয়াছি।৮

ইতি শ্রীসায়ণাচার্য্যের ভাষ্যানুযায়ী ঋগ্বেদোক্ত দেবীসূক্তের অনুবাদ সমাপ্ত।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- ইহা বৈদিক দেবীসূক্ত। শ্রীশ্রীচণ্ডীর পঞ্চম অধ্যায়ে ৮ম হইতে ৮২তম মন্ত্রকে তন্ত্রোক্ত দেবীসূক্ত বলে। কাহারও কাহারও মতে চণ্ডী তন্ত্রশাস্ত্র বলিয়া বৈদিক দেবীসূক্তের পরিবর্তে তান্ত্রিক দেবীসূক্ত পাঠই বিধেয়।

Wednesday, 21 October 2020

নবদুর্গাঃ-



শ্রীমার্কণ্ডেয়পুরাণে হরিহরব্রহ্মবিরচিত দেবীকবচে বর্ণিত আছে-

প্রথমং শৈলপুত্রীতি দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী .
তৃতীয়ং চন্দ্রঘণ্টেতি কূষ্মাণ্ডেতি চতুর্থকম্ .. ৩..
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা .
সপ্তমং কালরাত্রিশ্চ মহাগৌরীতি চাষ্টমম্ .. ৪..
নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গাঃ প্রকীর্তিতাঃ .
উক্তান্যেতানি নামানি ব্রহ্মণৈব মহাত্মনা .. ৫..

অনুবাদঃ- প্রথম শৈলপুত্রী, দ্বিতীয় ব্রহ্মচারিণী, তৃতীয় চন্দ্রঘন্টা, চতুর্থ কুষ্মাণ্ডা, পঞ্চম স্কন্দমাতা, ষষ্ঠ কাত্যায়নী, সপ্তম কালরাত্রি, অষ্টম মহাগৌরী এবং নবম সিদ্ধিদাত্রী (মোক্ষদা)- ইহারা নবদুর্গা বলিয়া প্রকীর্তিতা। এই সকল নাম সর্বজ্ঞ বেদ কর্তৃক উক্ত হইয়াছে ।।৩-৫।।

ব্যাখ্যাঃ-

১. শৈলপুত্রী-কূর্ম্মপুরাণমতে দেবী কারুণ্যবশে শৈল ভক্তের পুত্রীত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন।

২. ব্রহ্মচারিণী-তিনি ব্রহ্মজ্ঞানপ্রদা, কারণ ভক্তকে ব্রহ্মপ্রাপ্তি করানোই তাঁহার স্বভাব।

৩. চন্দ্রঘন্টা-চন্দ্রবৎ নির্মলঘণ্টা যাঁহার বা যিনি চন্দ্রাপেক্ষা অতিশয় লাবণ্যবতী বা আহ্লাদকারিণী।

৪. কুষ্মাণ্ডা- গুপ্তবতীটীকা অনুসারে- 'কু(কুৎসিত) উষ্ম(সন্তাপত্রয়) যে সংসারে, সেই সংসার যাঁহার অণ্ডে (উদরে) তিনি কুষ্মাণ্ড অর্থাৎ ত্রিবিধতাপযুক্ত-সংসার-ভক্ষণ-কর্ত্রী।'

৫. স্কন্দমাতা-ভগবতী হইতে উৎপন্ন বলিয়া সনৎকুমারের অন্য নাম স্কন্দ; তাঁহার মাতা স্কন্দমাতা।

৬. কাত্যায়নী- কাত্যায়নাশ্রমে দেবকার্য্যের জন্য আবির্ভূত হইয়া তিনি মুনির কন্যাত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম কাত্যায়নী।

৭. কালরাত্রি- দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে-'তিনি সর্বমারক কালেরও নাশিকা, কারণ মহাপ্রলয়ে কালেরও বিনাশ হয়।'

কাশীধামে নবদুর্গার নয়টী পৃথক মন্দির রয়েছে। নবরাত্রির সময় প্রতিপদ হইতে নবমী পর্যন্ত নয় দিবস যথাক্রমে শৈলপুত্রী হইতে সিদ্ধিধাত্রী মন্দিরে প্রত্যহ নবদুর্গার দর্শনার্থ নরনারীর ভিড় হয়।
...................................................................................................
তথ্যসূত্রঃ- শ্রীশ্রীচণ্ডী, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলিকাতা, চতুর্থ সংস্করণ, মাঘ ১৪০২।

Saturday, 20 June 2020

অর্গলা স্তোত্রঃ-


দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে-বারাহী তন্ত্রে বর্ণিত আছে,'অর্গলাস্তোত্র পাপ নাশ করে।' সিদ্ধির প্রতিবন্ধক পাপ অর্গলা সদৃশ। সেই পাপনাশক স্তোত্রেরও লক্ষণা দ্বারা অর্গলা নাম হইয়াছে।
ॐ অস্য শ্রীঅর্গলাস্তোত্রমন্ত্রস্য বিষ্ণুর্ঋষিঃ অনুষ্টুপ্ছন্দঃ শ্রীমহালক্ষ্মীর্দেবতা শ্রীজগদম্বাপ্রীত্যর্থং সপ্তশতীপাঠাঙ্গজপে বিনিয়োগঃ। এই অর্গলাস্তোত্রের ঋষি হলেন বিষ্ণু, ছন্দ হল অনুষ্টুপ ও দেবতা হলেন শ্রীমহালক্ষ্মী। জগজ্জননীর প্রীতির জন্য শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের অঙ্গরূপে এই স্তোত্র পাঠ করা হয়।
ॐ মার্কণ্ডেয় উবাচ।
ॐ জয় ত্বং দেবি চামুণ্ডে জয় ভূতাপহারিণি।
জয় সর্বগতে দেবি কালরাত্রি নমোঽস্তু তে।। ১

মার্কণ্ডেয় বললেন–
হে দেবী চামূণ্ডা, তোমার জয় হোক। হে দেবী, তুমি জীবের দুঃখনাশকারিণী; তুমি সর্বভূতে অবস্থিতা; আবার তুমিই প্রলয়ের অন্ধকার স্বরূপিণী কালরাত্রি। তোমায় নমস্কার করি।১

জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী ।
দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে ।। ২

হে দেবী, তুমি জয়ন্তী (জয়যুক্তা বা সর্বোৎকৃষ্টা), মঙ্গলা (জন্মমরণাদি বিকার নাশিনী); কালী (সর্বসংহারিণী), ভদ্রকালী (মঙ্গল-দায়িনী), কপালিনী (প্রলয়কালে ব্রহ্মাদির কপাল হস্তে বিচরণকারিণী), দুর্গা (দুঃখপ্রাপ্যা), শিবা (চিৎস্বরূপা), ক্ষমা (করুণাময়ী), ধাত্রী (বিশ্বধারিণী), স্বাহা (দেবপোষিণী) এবং স্বধা (পিতৃতোষিণী)-রূপা, তোমাকে নমস্কার।২
মধুকৈটভবিধ্বংসি বিধাতৃ-বরদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৩

হে মধুকৈটভনাশিনি, হে ব্রহ্মাবরদায়িনি তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার (কাম-ক্রোধাদি) শত্রু নাশ কর।৩
মহিষাসুরনির্ণাশি ভক্তনাং সুখদে নমঃ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৪

হে মহিষাসুরনাশিনি ও ভক্তগণের সুখদায়িনি, তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।৪
ধূম্রনেত্রবধে দেবি ধর্মকামার্থদায়িনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৫

হে দেবী, তুমি ধূম্রলোচন অসুরকে বধ করেছিলে। আবার তুমিই ভক্তকে ধর্ম, অর্থ ও কাম প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ শ্রুতিপ্রসিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞান লাভজনিত যশ প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
রক্তবীজবধে দেবি চণ্ডমুণ্ডবিনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৬

হে দেবী, তুমি রক্তবীজ, চণ্ড ও মুণ্ড অসুরত্রয়কে বধ করেছিলে। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
শুম্ভনিশুম্ভনির্ণাশি ত্রৈলোক্যশুভদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ৭

হে দেবী, তুমি শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করেছিলে। আবার তুমিই তিন লোকের কল্যাণকারিনী। তোমায় প্রণাম করি। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।৭
বন্দিতাঙ্ঘ্রিযুগে দেবি সর্বসৌভাগ্যদায়িনি ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৮

হে মহিষাসুরনাশিনি ও ভক্তগণের সুখদায়িনি, তোমাকে নমস্কার। আমাকে রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।
অচিন্ত্যরূপচরিতে সর্বশত্রুবিনাশিনি ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ৯

হে অচিন্ত্য-রূপ-চরিত্রে সর্বশত্রুবিনাশিনি দেবি, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।
নতেভ্যঃ সর্বদা ভক্ত্যা চাপর্ণে দুরিতাপহে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১০

হে অর্পণে, আশ্রিত ভক্তের পাপনাশিনি হে দেবি, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১০
ব্যাখ্যাঃ-অপর্ণা-ন+পর্ণ(পত্র)। পার্বতী যখন শিবকে পতিরূপে লাভ করিবার জন্য তপস্যা করিয়াছিলেন, সেই সময় তিনি একটি গলিত পাতাও ভক্ষণ করেননি। তাই তাঁহার অপর নাম হয় অপর্ণা।
স্তুবদ্ভ্যো ভক্তিপূর্বং ত্বাং চণ্ডিকে ব্যাধিনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১১

হে দেবী চণ্ডিকা, যে ভক্তিসহকারে তোমার স্তব করে, তুমি তার ব্যাধি নাশ করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।
চণ্ডিকে সততং যুদ্ধে জয়ন্তি পাপনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১২

হে দেবী চণ্ডিকা, তুমি সতত যুদ্ধে বিজয়িনী ও পাপনাশিনী। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১২
দেহি সৌভাগ্যমারোগ্যং দেহি দেবি পরং সুখম্ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১৩

হে দেবি, আমায় সৌভাগ্য ও আরোগ্য দাও এবং পরম সুখ দাও। আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১৩
বিধেহি দেবি কল্যাণং বিধেহি বিপুলাং শ্রিয়ম্ ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ১৪

হে দেবি, আমার কল্যাণ বিধান কর এবং আমাকে বিপুল শ্রী (ঐশ্বর্য) প্রদান কর।আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।১৪
বিধেহি দ্বিষতাং নাশং বিধেহি বলমুচ্চকৈঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৫

হে দেবী, তুমি আমার শত্রুনাশের সহায়ক হও। আমাকে দাও প্রচুর বল। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৫
সুরাসুরশিরোরত্ননিঘৃষ্টচরণাম্বুজে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৬

হে দেবী, দেবতা ও অসুরগণের মুকুটের মণি তোমার চরণপদ্মে লুটায়। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৬
ব্যাখ্যাঃ- দুর্গাপ্রদীপ টীকা অনুসারে দেবীর স্বরূপ দর্শন দ্বারা দেবাসুরগণের নির্বৈরতারূপ অদ্বৈতভাব ধ্বনিত হইয়াছে।
বিদ্যাবন্তং যশোস্বন্তং লক্ষ্মীবন্তঞ্চ মাং কুরু।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৭

তুমি আমাকে ব্রহ্মবিদ্যা, যশ ও ধন প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৭
দেবি প্রচণ্ডদোর্দণ্ডদৈত্যদর্পনিষূদিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৮

হে দেবী, তুমি প্রবল পরাক্রমশালী দৈত্যের দর্প চূর্ণ করেছো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৮
প্রচণ্ডদৈত্যদর্পঘ্নে চণ্ডিকে প্রণতায় মে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ১৯

হে দেবী চণ্ডিকা, তুমি প্রচণ্ড দৈত্যের দর্প হরণ করেছো। তোমার পায়ে সতত আমার প্রণাম রাখি। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।১৯
চতুর্ভূজে চতুর্বক্রসংস্তুতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২০

হে চতুর্ভূজা দেবী, হে পরমেশ্বরী, ব্রহ্মা চার মুখে তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২০
কৃষ্ণেন সংস্তুতে দেবি শশ্বদ্ভক্ত্যা সদাম্বিকে।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২১

হে দেবী অম্বিকা, কৃষ্ণ সর্বদা ভক্তিসহকারে তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২১
হিমাচলসুতানাথসংস্তুতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২২

হে পরমেশ্বরী, হিমালয়ের কন্যা উমার পতি শিব সর্বদা তোমার স্তব করেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২২
ইন্দ্রাণীপতিসদ্ভাবপূজিতে পরমেশ্বরি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২৩

হে পরমেশ্বরী, দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী শচী স্বামীর সন্ধান পাওয়ার জন্য তোমার পূজা করিয়াছিলেন। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২৩
ব্যাখ্যাঃ-গুপ্তবতী টীকা অনুসারে- পুরাণ বলে, দুর্বাশার অভিশাপে লক্ষ্মীহারা হয়ে ইন্দ্র সকলের অজ্ঞাতে একটি সরোবরের পদ্মের মৃণালে আত্মগোপন করেন। সেই সময় ইন্দ্রের পত্নী পৌলোমী চণ্ডীর আরাধনা করে স্বামীর সন্ধান পান।
দেবি ভক্তজনোদ্দাম-দত্তানন্দদয়েঽম্বিকে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ২৪

হে দেবি, ভক্তজনের হৃদয়ে অপার-আনন্দদয়কারিণি হে অম্বিকে, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।২৪
ভার্যাং মনোরমাং দেহি মনোবৃত্ত্যানুসারিণীম্।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।। ২৫

হে দেবী, আমার মন বুঝে চলবে এমন মনোরমা পত্নী আমাকে প্রদান করো। তুমি আমাকে রূপ অর্থাৎ পরমাত্মবস্তু, জয় অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রের জ্ঞান এবং যশ অর্থাৎ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্রজ্ঞের খ্যাতি প্রদান কর। তুমি আমার কামক্রোধ ইত্যাদি শত্রুগুলিকে নাশ করো।২৫
তারিণি দুর্গসংসার-সাগরস্যাচলোদ্ভবে ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি ।। ২৬

দুস্তর-সংসার-সাগরতারিণি হে গিরিসুতে, আমায় রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও এবং আমার শত্রু নাশ কর।২৬
ইদং স্তোত্রং পঠিত্বা তু মহাস্তোত্রং পঠেন্নরঃ।
সপ্তশতী সমারাধ্য বরমাপ্নোতি দুর্লভম্।। ২৭

এই স্তোত্র পাঠ করে মহাস্তোত্র সপ্তশতীস্তব পাঠ করতে হয়। এইভাবে সপ্তশতীর পূজা করলে মানুষ দুর্লভ বর পায়।২৭
ইতি অর্গলাস্তোত্রম্ সমাপ্তম্।
গুপ্তবতী ও দুর্গাপ্রদীপ টীকাদ্বয় অনুসারে অর্গলাস্তোত্র সমাপ্ত।