'অহম্' ইত্যাদি অষ্ট-মন্ত্রাত্মক ঋগ্বেদীয় দেবীসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি-অম্ভৃণ মহর্ষির কন্যা বাক্, দেবতা- পরব্রহ্মময়ী আদ্যাশক্তি, কেবল দ্বিতীয় মন্ত্রটি জগতী ছন্দে এবং অবশিষ্ট সপ্ত মন্ত্র ত্রিষ্টুপ্ ছন্দে নিবদ্ধ। শ্রীজগদম্বার প্রীতির নিমিত্ত সপ্তশতী চণ্ডীপাঠান্তে দেবীসূক্ত-পাঠের বিনিয়োগ হয়।
ঋগ্বেদ্ সংহিতা,১০ম মণ্ডল, ১০ম অনুবাক্, ১২৫ সূক্ত-
ॐ অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরাম্যহম্
আদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ ।
অহং মিত্রাবরুণোভা বিভর্ম্যহম্
ইন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিনোভা ।। ১
আমি একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, দ্বাদশ আদিত্য এবং
বিশ্ব দেবতারূপে বিচরণ করি। আমি মিত্র ও বরুণ উভয়কে ধারণ করি। আমি ইন্দ্র ও অগ্নি এবং
অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে ধারণ করি।১
অহং সোমমাহনসং বিভর্ম্যহং
ত্বষ্টারমুত পূষণং ভগম্।
অহং দধামি দ্রবিণং হবিষ্মতে
সুপ্রাব্যে যজমানায় সুন্বতে ।। ২
আমি দেবশত্রুহন্তা সোমদেবকে, ত্বষ্টা-নামক দেবতাকে
এবং পূষা ও ভগ (দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে দুইটি আদিত্য) নামক সূর্যদ্বয়কে ধারণ করি। উত্তম
হবিঃযুক্ত, উপযুক্ত হবিঃ দ্বারা দেবগণের তৃপ্তিসাধনকারী এবং বিধিপূর্বক সোমরসপ্রস্তুতকারী
যজমানের জন্য যজ্ঞফলরূপ ধনাদি আমিই বিধান করি।২
অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং
চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্ ।
তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা
ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশয়ন্তীম্ ।। ৩
আমিই সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, উপাসকগণের ধনপ্রদাত্রী,
পরব্রহ্মকে আত্মারূপে সাক্ষাৎকারিণী। অতএব যজ্ঞার্হগণের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠা। আমি
প্রপঞ্চরূপে বহুভাবে অবস্থিতা ও সর্বভুতে জীবরূপে প্রবিষ্টা। আমাকেই সর্বদেশে সুরনরাদি
যজমানগণ বিবিধভাবে আরাধনা করে।৩
ময়া সো অন্নমত্তি যো বিপশ্যতি
যঃ প্রাণিতি য ঈং শৃণোত্যুক্তম্ ।
অমন্তবো মাং ত উপক্ষিয়ন্তি
শ্রুধি শ্রুত শ্রদ্ধিবং তে বদামি ।। ৪
আমারই শক্তিতে সকলে আহার ও দর্শন করে, শ্বাসপ্রশ্বাসাদি
নির্বাহ করে এবং উক্ত বিষয় শ্রবণ করে। যাহারা আমাকে অন্তর্যামিনীরূপে জানে না, তাহারাই
জন্মমরণাদি ক্লেশ প্রাপ্ত হয় বা সংসারে হীন হয়। হে কীর্তিমান সখা, আমি তোমাকে শ্রদ্ধালভ্য
ব্রহ্মতত্ত্ব বলছি, শ্রবণ কর।৪
অহমেব স্বয়মিদং বদামি জুষ্টং
দেবেভিরুত মানুষেভিঃ ।
যং যং কাময়ে তং তমুগ্রং কৃণোমি
তং ব্রহ্মাণং তমৃষি তং সুমেধাম্ ।। ৫
দেবগণ ও মনুষ্যগণের প্রার্থিত ব্রহ্মতত্ত্ব আমি
স্বয়ং উপদেশ করিতেছি। আমি ঈদৃশ ব্রহ্মস্বরূপিণী। আমি যাহাকে যাহাকে ইচ্ছা করি তাহাকে
তাহাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ করি। আমি কাহাকে ব্রহ্মা করি, কাহাকে ঋষি করি এবং কাহাকেও বা অতি
ব্রহ্মমেধাবান্ করি।৫
অহং রুদ্রায় ধনুরাতনোমি
ব্রহ্মদ্বিষে শরবে হন্তবা উ ।
অহং জনায় সমদং কৃণোম্যহং
দ্যাবাপৃথিবী আবিবেশ ।। ৬
ব্রাহ্মণবিদ্বেষী হিংস্র-প্রকৃতি ত্রিপুরাসুর-বধার্থ
রুদ্রের ধনুকে আমিই জ্যা সংযুক্ত করি। ভক্তজনের কল্যাণার্থ আমিই যুদ্ধ করি এবং স্বর্গে
ও পৃথিবীতে অন্তর্যামিনীরূপে আমিই প্রবেশ করিয়াছি।৬
অহং সুবে পিতরমস্য মূর্ধন্
মম যোনিরপ্স্বন্তঃ সমুদ্রে ।
ততো বিতিষ্ঠে ভুবনানু বিশ্বো-
তামূং দ্যাং বর্ষ্মণোপস্পৃশামি ।। ৭
আমিই সর্বাধার পরমাত্মার উপরে দ্যুলোককে প্রসব
করিয়াছি। বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যস্থ যে ব্রহ্মচৈতন্য উহাই আমার অধিষ্ঠান। আমিই ভূরাদি সমস্ত
লোক সর্বভূতে ব্রহ্মরূপে বিবিধভাবে বিরাজিতা। আমিই মায়াময় দেহ দ্বারা সমগ্র দ্যুলোক
পরিব্যাপ্ত আছি।৭
অহমেব বাত ইব প্রবাম্যা-
রভমাণা ভুবনানি বিশ্বা ।
পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যৈ-
তাবতী মহিনা সংবভূব ।। ৮
আমিই ভূরাদি সমস্ত লোক সর্বভূত সৃষ্টি করিয়া বায়ুর
মতো স্বচ্ছন্দে উহার অন্তরে বাহিরে সর্বত্র বিচরণ করি। যদিও স্বরূপতঃ আমি এই আকাশের
অতীত অ পৃথিবীর অতীত অসঙ্গ-ব্রহ্মরূপিণী, তথাপি স্বীয় মহিমায় এই সমগ্র জগদ্-রূপ ধারণ
করিয়াছি।৮
ইতি শ্রীসায়ণাচার্য্যের ভাষ্যানুযায়ী ঋগ্বেদোক্ত
দেবীসূক্তের অনুবাদ সমাপ্ত।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- ইহা বৈদিক দেবীসূক্ত। শ্রীশ্রীচণ্ডীর
পঞ্চম অধ্যায়ে ৮ম হইতে ৮২তম মন্ত্রকে তন্ত্রোক্ত দেবীসূক্ত বলে। কাহারও কাহারও মতে
চণ্ডী তন্ত্রশাস্ত্র বলিয়া বৈদিক দেবীসূক্তের পরিবর্তে তান্ত্রিক দেবীসূক্ত পাঠই বিধেয়।

No comments:
Post a Comment
Note: only a member of this blog may post a comment.