Saturday, 11 April 2026

'মহালক্ষ্মীস্তোত্রম্' (বিষ্ণুপুরাণান্তর্গত)—

 


শ্রীপরাশর উবাচ

সিংহাসনগতঃ শক্রস্সম্প্রাপ্য ত্রিদিবং পুনঃ

দেবরাজ্যে স্থিতো দেবীং তুষ্টাবাব্জকরাং ততঃ ১॥

পরাশর কহিলেনতদনন্তর ইন্দ্র পুনর্ব্বার ত্রিদিব (স্বর্গ) প্রাপ্ত হওয়ায় দেবরাজ্যে স্থিত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়া পদ্মহস্তা দেবীকে (লক্ষ্মীকে) স্তব করিয়াছিলেন।

ইন্দ্র উবাচ

নমস্যে সর্বভূতানাং জননীমব্জসম্ভবাম্

শ্রিয়মুন্নিদ্রপদ্মাক্ষীং বিষ্ণুবক্ষঃস্থলস্থিতাম্ ২॥

ইন্দ্র বলিলেনসর্ব্বভূতের জননী, অব্জসম্ভবা (কমলোদ্ভবা), বিকসিত পদ্মলোচনা, বিষ্ণুর বক্ষঃস্থলস্থিতা লক্ষ্মীকে নমস্কার।

ত্বং সিদ্ধিস্ত্বং স্বধা স্বাহা সুধা ত্বং লোকপাবনী

সন্ধ্যা রাত্রিঃ প্রভা ভূতির্মেধা শ্রদ্ধা সরস্বতী

অয়ি লোকপাবনি! তুমি সিদ্ধি, তুমি সুধা, তুমি স্বাহা, স্বধা, সন্ধ্যা, রাত্রি, প্রভা, ভূতি (বিভূতি), মেধা, শ্রদ্ধা সরস্বতী।

যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা শোভনে

আত্মবিদ্যা দেবি ত্বং বিমুক্তিফলদায়িনী

অয়ি শোভনে দেবি! তুমি যজ্ঞবিদ্যা, মহাবিদ্যা, গুহ্যবিদ্যা এবং বিমুক্তি-ফলদায়িনী আত্মবিদ্যা।

আন্বীক্ষিকী ত্রয়ী বার্তা দণ্ডনীতিস্ত্বমেব

সৌম্যাসৌম্যৈর্জগদ্রূপৈস্ত্বয়ৈতদ্দেবি পূরিতম্

তুমিই তর্কবিদ্যা, ত্রয়ী (ঋক্, যজুঃ সামবিদ্যা), বার্তা (সংবাদ) দণ্ডনীতি। হে দেবি! তোমারই সৌম্যাসৌম্যরূপে এই জগৎ পূরিত (পরিপূর্ণ)

কা ত্বন্যা ত্বামৃতে দেবি সর্বযজ্ঞময়ং বপুঃ

অধ্যাস্তে দেবদেবস্য যোগচিন্ত্যং গদাভৃতঃ

দেবি! তোমা ভিন্ন অন্য কোন্ স্ত্রী যোগিগণের ধ্যেয় সেই গদাধর দেবদেবের (ভগবান্ বিষ্ণুর) সর্ব্বযজ্ঞময় শরীরে বাস করিতে পারে?

ত্বয়া দেবি পরিত্যক্তং সকলং ভুবনত্রয়ম্

বিনষ্টপ্রায়মভবত্ত্বয়েদানীং সমেধিতম্

হে দেবি! তুমি পরিত্যাগ করায় সকল ভুবনত্রয় বিনষ্টপ্রায় হইয়াছিল। ইদানীং তোমা দ্বারাই সংবর্দ্ধিত হইল।

দারাঃ পুত্রাস্তথাঽঽগারসুহৃদ্ধান্যধনাদিকম্

ভবত্যেতন্মহাভাগে নিত্যং ত্বদ্বীক্ষণান্নৃণাম্

অয়ি মহাভাগে! তোমার দৃষ্টিমাত্রে মনুষ্যদিগের স্ত্রী, পুত্র, গৃহ, সুহৃদ ধনধান্যাদি লাভ হইয়া থাকে।

শরীরারোগ্যমৈশ্বর্যমরিপক্ষক্ষয়ঃ সুখম্

দেবি ত্বদ্দৃষ্টিদৃষ্টানাং পুরুষাণাং দুর্লভম্

দেবি! তোমার দৃষ্টিদৃষ্ট পুরুষদিগের পক্ষে শরীরের আরোগ্য, ঐশ্বর্য্য, সুখ শত্রুপক্ষের বিনাশ কিছুই দুর্লভ নহে।

ত্বমম্বা সর্বভূতানাং দেবদেবো হরিঃ পিতা

ত্বয়ৈতদ্বিষ্ণুনা চাম্ব জগদ্ব্যাপ্তং চরাচরম্ ১০॥

তুমিই সর্ব্বভূতের মাতা আর দেবদেব শ্রীহরি হইল পিতা; তোমাদের উভয়ের দ্বারাই এই চরাচর জগৎ ব্যাপ্ত। ১০

মা নঃ কোশস্তথা গোষ্ঠং মা গৃহং মা পরিচ্ছদম্

মা শরীরং কলত্রং ত্যজেথাঃ সর্বপাবনি ১১

অয়ি সর্ব্ব-পাবনি! তুমি আমাদের কোশ (ধনভাণ্ডার), গোষ্ঠ (গোস্থান), গৃহ, পরিচ্ছদ (বস্ত্র), শরীর কলত্র (পত্নী) ত্যাগ করিও না।

মা পুত্রান্মা সুহৃদ্বর্গান্মা পশূন্মা বিভূষণম্

ত্যজেথা মম দেবস্য বিষ্ণোর্বক্ষঃস্থলাশ্রয়ে ১২

অয়ি বিষ্ণুবক্ষঃস্থলাশ্রয়ে! আমার পুত্রগণ, সুহৃদ্বর্গ, পশু বিভূষণ (অলঙ্কার) সকল ত্যাগ করিও না। ১২

সত্ত্বেন সত্যশৌচাভ্যাং তথা শীলাদিভির্গুণৈঃ

ত্যজ্যন্তে তে নরাঃ সদ্যঃ সন্ত্যক্তা যে ত্বয়াঽমলে ১৩॥

অয়ি অমলে! তুমি যাহাদিগকে ত্যাগ কর, তাহাদিগকে সত্ত্ব, সত্য, শৌচ শীলাদি গুণ সকলই ত্যাগ করে। ১৩

ত্বয়াঽবলোকিতাঃ সদ্যঃ শীলাদ্যৈরখিলৈর্গুণৈঃ

কুলৈশ্বর্যৈশ্চ পূজ্যন্তে পুরুষা নির্গুণা অপি ১৪॥

তুমি অবলোকন করিলে নির্গুণ পুরুষেরাও সদ্য শীলাদি অখিল গুণ, কুল ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন হয়। ১৪

শ্লাঘ্যঃ গুণী ধন্যঃ কুলীনঃ বুদ্ধিমান্

শূরঃ বিক্রান্তো যস্ত্বয়া দেবি বীক্ষিতঃ ১৫॥

হে দেবি! তুমি যাহাকে নিরীক্ষণ কর, সে শ্লাঘ্য (প্রশংসনীয়),  সে গুণী, সে ধন্য, সে কুলীন, সে বুদ্ধিমান্, সে শূর (বীর) এবং বিক্রান্ত (বিক্রমশালী) ১৫

সদ্যো বৈগুণ্যমায়ান্তি শীলাদ্যাঃ সকলা গুণাঃ

পরাঙ্গমুখী জগদ্ধাত্রী যস্য ত্বং বিষ্ণুবল্লভে ১৬

অয়ি জগদ্ধাত্রি বিষ্ণুবল্লভে! তুমি যাহার প্রতি পরাঙ্মুখী হও, তাহার শীলাদি সকল গুণ সদ্যঃই বৈগুণ্য প্রাপ্ত হয়। ১৬

তে বর্ণয়িতুং শক্তা গুণাঞ্জিহ্বাঽপি বেধসঃ

প্রসীদ দেবি পদ্মাক্ষি মাঽস্মাংস্ত্যাক্ষীঃ কদাচন ১৭॥

হে পদ্মাক্ষি দেবি! ব্রহ্মার জিহ্বাও তোমার গুণ বর্ণন করিতে অশক্ত (অক্ষম),  আমাদিগকে কদাচ ত্যাগ করিও না।১৭

ইতি শ্রীবিষ্ণুপুরাণে মহালক্ষ্মী স্তোত্রং সম্পূর্ণম্

—(বিষ্ণুপুরাণ, প্রথমাংশ, নবম অধ্যায়, ১১৫-১৩১)

তথ্যসূত্রঃ- মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস প্রণীত 'বিষ্ণুপুরাণম্', আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স।

শ্রীশুভ চৌধুরী

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।

মহামায়ার নির্গুণ তুরীয় স্বরূপের কথনঃ-

 


যে গুণাতীত নিত্য মঙ্গলময়ী শক্তি সর্বদা সকল স্থানেই অখণ্ড অবিকৃতরূপে বিরাজমান আছেন; যোগেন্দ্র পুরুষগণ যাঁকে সমাধিকালে নিজ আত্মমন্দিরে তুরীয় চৈতন্যরূপে অনুভব করতঃ চরিতার্থতা লাভ করেন, তাঁরই সত্ত্ব অংশে সরস্বতী, রজঃ অংশে মহালক্ষ্মী আর তমঃ অংশে মহাকালী এই তিনটি অসীম ঐশ্বর্যশালিনী অনুপম রমণীমূর্তির আবির্ভাব হয়। দেবীভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে

নির্গুণা যা সদা নিত্যা ব্যাপিকা বিকৃতা শিবা

যোগগম্যাঽখিলাধারা তুরীয়া যা সংস্থিতা

তস্যাস্তু সাত্ত্বিকী শক্তী রাজসী তামসী তথা

মহালক্ষ্মীঃ সরস্বতী মহাকালীতি তাঃ স্ত্রিয়ঃ

-(দেবীভাগবত-১।২।১৯-২০)

যিনি সদা নির্গুণা, নিত্যা, ব্যাপিকা, অপরিণামিনী শিবা (মঙ্গলরূপিণী) এবং যিনি ধ্যানগম্যা, বিশ্বাধারা তুরীয়ারূপে সংস্থিতা, তাঁর সাত্ত্বিকী, রাজসী তামসী শক্তিই যথাক্রমে মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী মহাকালী।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য মহামায়ার গুণত্রয়াতীত তুরীয় স্বরূপের কথা স্পষ্টতঃই সৌন্দর্যলহরীতে বর্ণনা করেছেন

গিরামাহুর্দেবীং দ্রুহিণগৃহিণীমাগমবিদো

হরেঃ পত্নীং পদ্মাং হরসহচরীমদ্রিতনয়াম্

তুরীয়া কাপি ত্বং দুরধিগমনিঃসীমমহিমা

মহামায়া বিশ্বং ভ্রময়সি পরব্রহ্মমহিষি ৯৭॥

হে পরব্রহ্মমহিষি! আগমবিদ্গণ ব্রহ্মার পত্নীকে বাগদেবী; বিষ্ণুর পত্নীকে লক্ষ্মী এবং পর্বত-তনয়া দুর্গাকে মহেশ্বরের সহচরী বলে নির্দেশ করে থাকেন। হে মহামায়া! এই শক্তিত্রয় হতে অতিরিক্তা গুণত্রয়াতীতা চতুর্থা তুমি কে? আমরা তা নিরূপণ করতে সমর্থ নই। তোমার দুরধিগম্য মহিমার সীমা নিরূপিত হয় না। তুমি এই ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডলকে মোহিত করছ।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. শ্রীমদ্দেবীভাগবতম্ মহাপুরাণম্, শৈবশ্রী নীলকণ্ঠ ভট্ট বিরচিত তিলকাখ্য টীকা সমেত।

. শিবাবতার শঙ্করাচার্যের গ্রন্থমালা, চারখণ্ড, আনন্দলহরী, অচ্যুতানন্দ লক্ষ্মীধরের টীকা সমেত, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর ১৮, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।